প্রশ্ন ঃ ভারতে বামপন্থী ভাবধারা ও আন্দোলনের প্রসারে মানবেন্দ্রনাথ রায়ের অবদান সম্পর্কে আলোচনা কর।
উত্তর ঃ মানবেন্দ্রনাথ রায় ছিলেন ভারতবর্ষের স্বাধীনতার পূর্বাবধি সমাজতন্ত্রীদের নেতা। তাঁর আসল নাম হল নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য । বিপ্লবী প্রয়াস সাধনে তিনি অসংখ্য ছদ্মনাম গ্রহণ করেন, যেমন— মি. মার্টিন, হরি সিং, ডা. মাহমুদ, মি. হোয়াইট, মি. ব্যানার্জী ইত্যাদি । তবে এম. এন. রায় নামেই তিনি সমধিক পরিচিতি । ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন তিনি। বিশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে ভারতে বামপন্থী ভাবধারা জনপ্রিয় হতে থাকলে তিনি ভারতে বামপন্থী ভাবধারা ও আন্দোলনের প্রসারে সর্বাধিক অগ্রগণ্য ভূমিকা নেন। কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে ভারতের উপনিবেশ-বিরোধী আন্দোলন এক অন্য রূপ ধারণ করে।
বিপ্লবী আন্দোলনে অংশগ্রহণ- বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউটে পড়াকালীনই তিনি অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন । পরে তিনি যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় 'বাঘাযতীন' -এর সংস্পর্শে আসেন । প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে বাঘাযতীনের নির্দেশে তিনি জার্মান অস্ত্র সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ইন্দোনেশিয়ার বাটাভিয়ায় চলে যান । কিন্তু বাঘাযতীনের এই অস্ত্র সংগ্রহের পরিকল্পনা সফল হয়নি । পরবর্তীকালে আমেরিকা হয়ে তিনি মেক্সিকোতে পৌছান। মেক্সিকোতে থাকাকালীন সোশ্যালিস্ট পার্টির সংস্পর্শে এলে তিনি মার্কসবাদের প্রতি আকৃষ্ট হন । এখানে বিশিষ্ট রুশ বিপ্লবী ও কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের প্রতিনিধি বলশেভিক নেতা মিখাইল বোরোদিনের সঙ্গে তিনি পরিচত হন ও মার্কসবাদে দীক্ষা নেন। বোরোদিন ও তাঁর মিলিত উদ্যোগে রাশিয়ার বাইরে মেক্সিকোতে তাঁর সভাপতিত্বে প্রথম কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয় । এসময় থেকেই তিনি মানবেন্দ্রনাথ রায় নামে পরিচত হন।
কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা:- ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ১৯শে জুলাই থেকে ৭ই আগস্ট রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের (কমিন্টার্ন) দ্বিতীয় অধিবেশনে লেলিনের আমন্ত্রণে মেক্সিকো কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধি হিসেবে মানবেন্দ্রনাথ যোগদান করেন । ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ১৭ই অক্টোবর মানবেন্দ্রনাথ রায় অবনী মুখার্জী ও ২৪ জন মুহাজিরিনকে নিয়ে রাশিয়ার তাসখন্দে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করেন । যা পরের বছরই কমিনটার্ন- এর স্বীকৃতি লাভ করে।
পত্রিকা প্রকাশ:- মানবেন্দ্রনাথ ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে বার্লিন থেকে “ভ্যানগার্ড অব ইন্ডিয়ান ইনডিপেন্ডেন্স” নামে একটি পাক্ষিক পত্রিকা প্রকাশ করে তা ডাকযোগে ভারতের নানা অঞ্চলে পাঠাতে থাকেন। পত্রিকাটির নাম কয়েকবার পরিবর্তন করলেও ব্রিটিশ সরকার বারবার পত্রিকাটি নিষিদ্ধ করে।
ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলনে ভূমিকা:- ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি আনুষ্ঠানিক ভাবে আত্ম প্রকাশের পূর্বেই কিছু বিপ্লবী নিজ প্রচেষ্টায় কমিউনিস্ট গোষ্ঠী গঠনের চেষ্টা করলে এম. এন রায় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য নলিনী গুপ্ত ও শওকত উসমানীকে ভারতে পাঠান। রাশিয়া থেকে মানবেন্দ্রনাথ রায় বিভিন্ন পুস্তিকা, অর্থ ও দূত পাঠিয়ে ভারতে কমিউনিস্ট মতাদর্শের প্রসার ঘটানোর প্রয়াস চালান । মানবেন্দ্রনাথ রায়ের নির্দেশে নলিনী গুপ্ত, মহম্মদ শরিফ, ফিরোজ উদ্দিন মনসুর, আব্দুল মজিদ, রফিক আহমেদ ও শওকত ওসমানিসহ প্রাক্তন মুহাজিরিনদের একটি দল ভারতে ফিরে কমিউনিস্ট মতাদর্শের প্রচার চালায় । তাঁর প্রেরণায় মুজাফফর আহমেদের নেতৃত্বে কলকাতায় এবং এস এ ডাঙ্গের নেতৃত্বে পশ্চিম ভারতে কমিউনিস্ট আদর্শ প্রচারিত হয়। মানবেন্দ্রনাথ রায়ের উদ্যোগেই ভারতের নানা প্রান্তে সাম্যবাদী আদর্শে বিশ্বাসী মানুষজনের সহযোগিতায় কমিউনিস্ট পার্টির শাখা গড়ে ওঠে যার চূড়ান্ত পরিণতি ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে কানপুরে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা। এখানে প্রথম সর্বভারতীয় কমিউনিস্ট সম্মেলন হয় এবং এখানেই সিঙ্গারাভেলু চেট্টিয়ারের সভাপতিত্বে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয়।
কমিউনিস্ট আন্দোলনে পরিচালনায় রণকৌশল:- মানবেন্দ্রনাথ রায় চেয়েছিলেন কমিউনিস্ট পার্টি জাতীয় আন্দোলনে অংশ নেবে, কংগ্রেসের মধ্যে থেকে বিরোধিতা করবে এবং ভবিষ্যতে কংগ্রেসের বিকল্প হয়ে উঠবে এবং কমিউনিস্ট দল গোপনে কৃষক ও শ্রমিকদের সংগঠিত করে বিপ্লবের ক্ষেত্র প্রস্তুত করবে । এই কারনে, ভারতে কমিউনিস্ট দলকে শক্ত ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তিনি দ্বিস্তর আন্দোলনের কথা তুলে ধরেন —
১. জাতীয় আন্দোলনে যোগদানের মাধ্যমে আইনগত ও বৈধভাবে আন্দোলন করা।
২. গোপনে শ্রমিক-কৃষক সংগঠন দ্বারা দলের নিজস্ব ভিত্তি শক্ত করা।
মানবেন্দ্রনাথ রায় চাইতেন ভারতের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা । অর্থনৈতিক দিক থেকে ভারত যদি স্বাধীন হয়, তবেই ভারত প্রকৃত স্বাধীনতা পাবে, এই ছিল তার উপলদ্ধি ।
কংগ্রেসে যোগদান :- নানা অভিযোগে মানবেন্দ্রনাথ রায়কে ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ও কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল থেকে বহিস্কার করা হয় । এরপর মানবেন্দ্রনাথকে ১৯৩০
খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার গ্রেফতার করে। ৬ বছর কারাবাসের পর তিনি মুক্তিলাভ করেন।
মুক্তিলাভের পর কংগ্রেসের অভ্যন্তরে বামপন্থী ভাবধারার প্রসার ঘটানোর জন্য তিনি কংগ্রেসে
যোগ দেন এবং কংগ্রেসের অভ্যন্তরে ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে “লিগ অব র্যাডিক্যাল কংগ্রেসমেন” প্রতিষ্ঠা করেন।
তিনি কংগ্রেসে সুভাষচন্দ্র বসুকে সভাপতি পদে সমর্থন জানান।
পরবর্তীকালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে তিনি কংগ্রেসের সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন । তাই শেষে তাঁর চিন্তাভাবনার স্বতন্ত্রতা বজায় রাখতে এবং কংগ্রেসের অভ্যন্তরে বামপন্থী ভাবধারা প্রসারের বিশেষ সম্ভাবনা না থাকায় কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে তিনি ''র্যাডিক্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি' প্রতিষ্ঠা করেন।
তাঁর লেখা বই :- মানবেন্দ্রনাথ বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি স্পানিস, জার্মান ও ফরাসি সহ ১৭টি ভাষা জানতেন। তাঁর রচিত ৬৭টি গ্রন্থ ও ৩৯টি পুস্তিকার কথা জানা যায়। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নিউ হিউম্যানিজম, মাই মেমোয়ার্স, ইন্ডিয়া ইন ট্রানজিশন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অবক্ষয় ও পতন, ইসলামের ঐতিহাসিক ভূমিকা, বিজ্ঞান ও কুসংস্কার, নব মানবতাবাদ, রেভলিউশন এন্ড কাউন্টার, রেভলিউশন ইন চায়না, রিজন রোমান্টিসিজম এন্ড রেভলিউশন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
উপসংহার :- আমৃত্যু বামপন্থী ভাবধারা ও আন্দোলনের প্রসারে নিরলস লড়াই চালিয়ে এই কমিউনিস্ট নেতা ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের ২৫ জানুয়ারি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে দেরাদুনে পরলোক গমন করেন। অমৃতবাজার পত্রিকা তাঁকে “সারা বিশ্বে বিচরণকারী নিঃসঙ্গ সিংহ” বলে অভিহিত করেছে।
No comments:
Post a Comment