Friday, June 4, 2021

Higher Secondary - History

প্রশ্ন:- জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট এবং প্রতিক্রিয়া আলোচনা কর।

 উত্তর:- ১৩ই এপ্রিল, ১৯১৯ সাল। ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাসের একটি কলঙ্কময় দিন। ব্রিটিশের এক সেনা কর্মকর্তা পাঞ্জাবের অমৃতসরের বিক্ষোভ-রত নিরস্ত্র মানুষের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিল সেদিন। পরিণতিতে শত শত লোকের মৃত্যু হয়।জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড নামে পরিচিত ঐ ঘটনার সূচনা অমৃতসরের একটি সমাবেশ থেকে।  

অমৃতসর শিখ সম্প্রদায়ের একটি পবিত্র শহর। এই শহরেই শিখদের পবিত্র স্বর্ণ মন্দির। ১৯১৯ সালে এই শহরে ভারতীয় স্বাধীনতাকামীদের সাথে তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকদের মধ্যে চরম উত্তেজনা চলছিলো। রাওলাট আইনের প্রতিবাদে গান্ধীজীর আহবানে সাড়া দিয়ে সমগ্র দেশ জুড়ে শুরু হয় সত্যাগ্রহ আন্দোলন। এপ্রিলের ১৩ তারিখে শহরে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর একজন সিনিয়র অফিসার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডায়ার খবর পেলেন অমৃতসর শহরের জালিয়ানওয়ালাবাগ নামক উদ্যানে বিক্ষোভের জন্য মানুষজন জড় হচ্ছে। সাথে সাথেই তিনি একদল সৈন্য নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে সেখানে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সমাবেশে পুলিশ বাহিনীকে গুলি চালানোর নির্দেশ দিলে সরকারি মতে ৩৭৯ জন নিহত ও ১২০০ জন আহত হন। যদিও বেসরকারি মতে এই সংখ্যাটা অনেক বেশি। বর্বর ব্রিটিশ পুলিশের এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড নামে পরিচিত।

 প্রেক্ষাপট:- এই হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট নীচে আলোচনা করা হল।

1. ব্রিটিশ সরকারের তীব্র অত্যাচার:- অত্যাচারী বৃটিশ সরকারের বিভিন্ন দমনমূলক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে পাঞ্জাবে ব্রিটিশ বিরোধী গণআন্দোলন ক্রমশ তীব্র হতে থাকে। পাঞ্জাবের মুখ্য প্রশাসক লেফটেন্যান্ট গভর্নর  মাইকেল ডায়ারের অত্যাচারী শাসন পাঞ্জাবকে বারুদের স্তূপে পরিণত করেতিনি জুলুম চালিয়ে যুদ্ধের জন্য পাঞ্জাব থেকে সেনা ও অর্থ সংগ্রহ এবং বিদ্রোহ বিপ্লব প্রতিরোধ করতে পাঞ্জাবীদের ওপর চরম নির্যাতন চালাচ্ছিলেন। এইসব ঘটনা ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে মানুষকে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ করে তোলে।  

2. কুখ্যাত রাওলাট আইন প্রণয়ন:- সরকার ভারতীয়দের যাবতীয় স্বাধীনতার অধিকার কেড়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে কুখ্যাত নিষ্ঠুর দমনমূলক ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে রাওলাট আইন প্রবর্তন করলে দেশবাসী ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং এই বিক্ষোভের আঁচ পাঞ্জাবে সবথেকে গভীর এবং অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।

3. বিভিন্ন নেতৃবৃন্দের গ্রেপ্তার:- এই সময় সরকার ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে ১০ এপ্রিল অমৃতসরের স্থানীয় দুই নেতা সইফুদ্দিন কিচলু ও সত্য পালকে হিংসায় মদত দেওয়ার অভিযোগে গ্রেফতার করলে জনতা উত্তেজিত হয়ে ওঠে অন্যদিকে গান্ধীজিকে গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়লে লাহোরে স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মঘট পালিত হয় মারমুখী জনতা বিভিন্ন সরকারি অফিস-আদালত, টেলিগ্রাফ লাই্‌ন, ইউরোপীয় নারী-পুরুষের ওপর আক্রমণ চালায়।

4. সামরিক শাসন জারি:-  অমৃতসরে আন্দোলন প্রবল হয়ে উঠলে জেনারেল মাইকেল ও' ডায়ারের নেতৃত্বে সামরিক বাহিনীর হাতে পাঞ্জাবের শাসনভার তুলে দেওয়া হয় সামরিক আইন জারি করে ১১ ই এপ্রিল শহরে জনসভা ও সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়।

 হত্যাকান্ড:- এই অবস্থায় ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে ১৩ এপ্রিল জালিয়ানওয়ালাবাগ নামক উদ্যানে প্রায় ১০ হাজার জনতা সমবেত হয়েছিল দুই জনপ্রিয় নেতা সইফুদ্দিন কিচলু ও ডক্টর সত্যপালের গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে। সভাস্থলটি চারদিকে ছিল বড় পাকা বাড়ি এবং প্রাচীর দিয়ে বেষ্টিত একটি উদ্যান এই উদ্যানে প্রবেশের জন্য ছিল একটি পথ এবং প্রস্থানের জন্য ছিল চারটি সংকীর্ণ গলিপথ। এই নির্দিষ্ট স্থানে বৈশাখী মেলা উপলক্ষে উপস্থিত হওয়ার নারী-পুরুষ ও শিশুদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন যারা ১১ এপ্রিল ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক পাঞ্জাবে সামরিক শাসন জারি ও জনসভা ও সমাবেশ নিষিদ্ধের কথা জানত না। পাঞ্জাবি সামরিক শাসন কর্তা মাইকেল ও' ডায়ার  বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে সেখানে উপস্থিত হন এবং মাঠের ওই প্রবেশ পথ আটকে ৫০ টি রাইফেল থেকে জনগণকে কোন প্রকার সতর্কবার্তা না দিয়ে সেনাবাহিনীকে নির্বিচারে গুলি করার নির্দেশ দেন। সেনাবাহিনী ১০ মিনিট ধরে প্রায় ১৬ রাউন্ড গুলি চালায়। প্রচুর মানুষ হতাহত হয় সরকারি হিসাব অনুসারে নিহতের সংখ্যা ছিল ৩৭৯ জন এবং আহতের সংখ্যা ছিল ১২ জন। কিন্তু বেসরকারি হিসেবে মৃতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যায়। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের জন্য সরকারের তরফ থেকে কোনো ক্ষমা স্বীকার করা হয়নি শুধু তাই নয় ওই দিন অমৃতসরে সান্ধ্য আইন জারি করে মৃতদেহগুলোকে তাদের আত্মীয়দের হাতে তুলে দেওয়া কিংবা আহতদের সেবা শুশ্রূষা করার কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি। সামরিক বাহিনী অমৃতসরের বাইরে পাঞ্জাবের অন্যত্রও চূড়ান্ত অত্যাচার ও নির্যাতন চালায়। 'মার্শাল ল কমিশন' (১৯১৯ খ্রি.) গঠন করে মৃত্যুদণ্ড, বেত্রাঘাত, হাতে-পায়ে শেকল বেঁধে অত্যাচার প্রভৃতি নির্যাতন ব্যাপক মাত্রায় চলতে থাকে।

প্রতিক্রিয়া:-

এই ভয়ানক ও মর্মান্তিক হত্যাকান্ডের ঘটনায় ব্রিটিশ শাসনের প্রকৃত নগ্ন রূপটি প্রকাশ হয়ে পড়ে সরকার জালিয়ানওয়ালাবাগের সভায় গুলি চালানোর ঘটনাকে সমর্থন করে। ভারত-সচিব মন্টেগু এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে 'নিবারণমূলক হত্যাকাণ্ড বলে অভিহিত করেন। তবে ভারতীয়রা এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে  এবং সারা দেশে বিদেশে সর্বত্রই এই নগ্ন স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।

1. এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইংরেজদের দেওয়ার 'নাইট' উপাধি ঘৃণাভরে ত্যাগ করেন এবং বলেন "পাঞ্জাবের দুঃখের তাপ আমার বুকের পাঁজর পুড়িয়ে দিলে।"

2.  রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন "জালিয়ানওয়ালাবাগ সমগ্র ভারতে এক মহাযুদ্ধের আগুন জ্বেলে দেয়।"

3.  মহাত্মা গান্ধিজিও ব্রিটিশদের দেওয়া 'কাইজার-ই-হিন্দ' উপাধি ত্যাগ করেন। একসময় ব্রিটিশ শাসনকে 'ঈশ্বরের আশীর্বাদ' মনে করা গান্ধিজি এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদস্বরূপ তার ইয়ং ইন্ডিয়া পত্রিকায় লেখেন যে, "এই শয়তান সরকারের সংশোধন অসম্ভব, একে অবশ্যই ধ্বংস করতে হবে।"

4.  জাতীয় কংগ্রেস জালিয়ানওয়ালা-বাগের হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা করে। কংগ্রেস নেতা সি.এফ. এন্ড্রুজ এই ঘটনাকে 'কসাইখানার গণহত্যার’ (It was a massacre, a butchery) সমতুল্য বলে নিন্দা করেছেন। ব্রিটিশ সরকারের ওপর আস্থা হারিয়ে কংগ্রেস নিজের উদ্যোগে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। এই কমিটি ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ২৫ মার্চ তার রিপোর্টে হত্যাকাণ্ডের জন্য ডায়ারকে দোষী সাব্যস্ত করে তাকে শাস্তিদানের সুপারিশ করে।

5.  ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল বলেন "জালিয়ানওয়ালাবাগের মত মর্মান্তিক ঘটনা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে আর কখনো ঘটেছে বলে আমার মনে হয় না।"

6.  এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সমগ্র দেশের মানুষ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা ও ক্ষোভে ফেটে পড়েন।

7.  এই হত্যাকাণ্ড ভারতবাসীকে এক তীব্র ইংরেজ বিরোধীতে পরিণত করেছিলো যার পরিণতিতে ঘটেছিল অসহযোগ আন্দোলনে।

8.  অবশ্য এত প্রতিবাদ ও সমালোচনা সত্ত্বেও ব্রিটিশ সরকার ভারতীয়দের কথায় কোন প্রকার কর্ণপাত করেনি।

 মূল্যায়ন:-

 পরিশেষে বলা যায় ব্রিটিশ সরকার কর্ণপাত না করলেও শেষ পর্যন্ত উধম সিং নামে এক ভারতীয় ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে জেনারেল ও ডায়ারকে হত্যা করে জালিয়ান ওয়ালাবাগের হত্যাকান্ডের প্রতিশোধ নিয়েছিলেন। জালিয়ানওয়ালাবাগের ঐ গণহত্যা ভারতের জাতীয়তাবাদকে আরো কঠোর করে তুলেছিলগান্ধি লিখেছিলেন আমরা ডায়ারের শাস্তি চাইনা, যে ব্যবস্থা ডায়ারের মত মানুষ  তৈরি করে, আমরা তার পরিবর্তন চাই।     


No comments:

Post a Comment